২০২৬ সালের পেঁয়াজ মৌসুমে দেশের অধিকাংশ চাষী এক বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। মাঠ থেকে কষ্ট করে তোলা পেঁয়াজ ঘরে বা গুদামে রাখার অল্প দিনের মধ্যেই পচে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষকই বুঝতে পারছেন না কেন এবার এত দ্রুত পেঁয়াজ নষ্ট হলো। মূলত আবহাওয়া, চাষের পদ্ধতি এবং জাতের কিছু পরিবর্তনের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। কৃষক
ভাইদের সহজ বোঝার জন্য পেঁয়াজ পচে যাওয়ার মূল কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
পেঁয়াজ তোলার সময়ে বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টি (আর্দ্রতার প্রভাব)
পেঁয়াজ পরিপক্ব হওয়া এবং মাঠ থেকে তোলার ঠিক আগের দিনগুলোতে এবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসময়ে কয়েক দফা ভারী বৃষ্টিপাত ও কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে।
ভেতরকার সমস্যা:
পেঁয়াজ যখন পরিপক্ব হয়, তখন তার অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বৃষ্টির কারণে মাটি অতিরিক্ত ভিজে যাওয়ায় পেঁয়াজের কন্দ (মূল অংশ) মাটির নিচে থাকা অবস্থাতেই অতিরিক্ত পানি শুষে নেয়।
পচনের সূত্রপাত:
ভেজা মাটি থেকে পেঁয়াজ তোলার কারণে পেঁয়াজের গায়ে কাদা লেগে থাকে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব পেঁয়াজের গায়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য একদম উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ফলে গুদামে রাখার পর এগুলো দ্রুত পচতে শুরু করে।
কিছু উচ্চ ফলনশীল জাতের পেঁয়াজ ও এর সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা
বিগত কয়েক বছরের মতো ২০২৬ সালেও চাষী ভাইয়েরা বেশি ফলন পাওয়ার আশায় ব্যাপকভাবে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড/কিছু স্পেশাল জাতের পেঁয়াজ চাষ করেছেন।
পার্থক্যটি কোথায়?
আমাদের দেশি সনাতন জাতের পেঁয়াজের ভেতরের রস বা পানির পরিমাণ কম থাকে, যার কারণে এগুলো দীর্ঘদিন মাচায় বা ঘরে রেখে খাওয়া যায়। কিন্তু হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের ভেতরে পানির পরিমাণ বা রসের ভাগ অনেক বেশি থাকে।
ভুল পদ্ধতি:
অনেক কৃষকই হাইব্রিড পেঁয়াজ তুলে দেশি পেঁয়াজের মতোই সাধারণ গুদামে বা ঘরের মাচায় মাসের পর মাস রেখে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হাইব্রিড পেঁয়াজ দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের উপযোগী নয়; এটি তোলার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে বিক্রি করে দিতে হয়। এই সাধারণ ধারণাটির অভাবে এবার বিপুল পরিমাণ হাইব্রিড পেঁয়াজ পচে গেছে।
সঠিক উপায়ে ‘কিউরিং’ বা শুকানোর অভাব
পেঁয়াজ মাঠ থেকে তোলার পর সেটিকে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় ‘কিউরিং’ বলা হয়। এটি পেঁয়াজ টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
কেন এবার কিউরিং ঠিকমতো হয়নি?
মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার পর টানা কয়েকদিন কড়া রোদের প্রয়োজন হয়, যাতে পেঁয়াজের বাইরের চামড়া কাগজের মতো শুকিয়ে শক্ত হয় এবং পেঁয়াজের গলাটি শুকিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এবার পেঁয়াজ তোলার মৌসুমে আকাশে মেঘ এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা (ভেজা ভাব) থাকার কারণে পেঁয়াজ ঠিকমতো শুকানো যায়নি।
ফলাফল:
পেঁয়াজের গলা বা বোঁটা কাঁচা বা নরম থাকা অবস্থাতেই তা ঘরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বোঁটা খোলা থাকায় বাতাস থেকে ছত্রাকের জীবাণু সহজেই পেঁয়াজের ভেতরে ঢুকে পড়েছে এবং ভেতর থেকে পচন শুরু হয়েছে, যা বাইরে থেকে প্রথমে বোঝাই যায়নি।
ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন সারের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহার
বেশি ফলন এবং পেঁয়াজের আকার বড় করার আসায় অনেক চাষী জমিতে পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি ইউরিয়া (নাইট্রোজেন) সার ব্যবহার করেছেন।
গাঠনিক দুর্বলতা:
অতিরিক্ত ইউরিয়া সার দিলে পেঁয়াজ দ্রুত বড় হয় ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের কোষগুলো অত্যন্ত নরম এবং ফাঁপা হয়ে যায়। এই পেঁয়াজগুলোর বোঁটা বা গলা অনেক মোটা হয়।
অতি মাত্রায় ইউরিয়া ব্যবহারে ক্ষতি:
মোটা বোঁটাযুক্ত পেঁয়াজ সহজে শুকাতে চায় না এবং তা খুব দ্রুত রোগবালাই ও ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম সার (টিএসপি, এমওপি এবং জিপসামের সঠিক অনুপাত) ব্যবহার না করে কেবল ইউরিয়ার ওপর নির্ভর করায় পেঁয়াজের টেকসই ক্ষমতা কমে গেছে।
গুদামে বাতাস চলাচলের অভাব এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকট
পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য শুষ্ক এবং বাতাস চলাচলযুক্ত (Ventilated) ঘরের প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের মাসগুলোতে তীব্র গরমের পাশাপাশি বাতাসে ভ্যাপসা গরম বা আর্দ্রতা অনেক বেশি ছিল।
বদ্ধ পরিবেশের ক্ষতি:
কৃষকরা যখন ঘরের মেঝেতে বা মাচায় গাদাগাদি করে পেঁয়াজ স্তূপ করে রেখেছেন, তখন ভেতরের গরম বাতাস বের হতে পারেনি। পেঁয়াজ নিজেই এক ধরণের তাপ উৎপন্ন করে।
বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির সংকট:
অনেক এলাকায় পেঁয়াজ ভালো রাখতে বড় ফ্যান বা আধুনিক এয়ারফ্লো (Airflow) মেশিন বসানো হলেও লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তা নিয়মিত চালানো যায়নি। ফলে গুদামের ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে গিয়ে পেঁয়াজগুলো আক্ষরিক অর্থেই ‘সেদ্ধ’ হওয়ার মতো হয়ে দ্রুত পচে গেছে।
কৃষকদের জন্য সংক্ষিপ্ত পরামর্শ:
আগামীতে এই ক্ষতি এড়াতে পেঁয়াজ তোলার পর অন্তত ৭-১০ দিন ছায়াযুক্ত বাতাস চলাচল করা জায়গায় ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। মোটা গলাযুক্ত এবং কিছু উচ্চ ফলনশীল জাতের পেঁয়াজ বেশিদিন ধরে না রেখে দ্রুত বাজারে বিক্রি করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।